তোমার অপেক্ষায় আমার বসন্ত

মুুহাম্মদ দিদারুল আলম
সমুদ্র প্রিয়তার লাল শাড়ি পরে খোলা চুল বাতাসে দোল খেলানোর মত। যতই দেখা হয় না কেন মুগ্ধতা থেকে যায়! সমুদ্র্রে একা হাঁটতে হাঁটতে কথাগুলো ভাবনায় আসে শুভর। সারাদিন হোটেলে ঘুমিয়ে বিকেলে এসেছে সে সমুদ্রে সূর্যের অস্ত যাওয়া দেখবে বলে। সন্ধ্যা হয়ে এলো, এ যেন দিন বাড়ি যাচ্ছে! অন্যমনস্ক শুভ হালকা আলো অন্ধকারে পিছন থেকে ধাক্কা লাগায় চোখাচোখি হলো শাম্মী আর শুভ।

  • সরি
  • ইটস্ ওকে।
    সমুদ্রে ঢেউর সাথে ঢেউয়ের মিতালি দেখা শেষে রাতে যখন হোটেলে আসে তখন লবিতে শুভকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শাম্মী। বাবা মা রুমে গেলেও শাম্মী না গিয়ে শুভর দিকে এগিয়ে যায়।
  • আরে আপনি?
  • জ্বি এক বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছি।
  • আবারও সরি।
  • কেন?
    ধাক্কাটা জোরে লেগেছিলো তাই।
  • শুধু শুধু ভাবছেন,আমি কিছু মনে করিনি। আচ্ছা, আপনি এখানে কেন?
  • আমরাতো এ হোটেলে ওঠেছি।
    -আমিও এখানে ওঠেছি ৩০৪ এ, সাথে একজন বন্ধু আছে। যার জন্য এখন অপেক্ষা করছি।
  • তাই নাকি কি আশ্চার্য দেখুন না আমরাও কিন্তু ৫০৭ এ। মা-বাবা আর আমি।
    দেখুন না- এতক্ষণ কথা বলছি অথচ আপনার নাম জানা হলো না।
  • জি, আমি শাম্মী। বগুড়া থেকে এসেছি, প্রতি বছরই আসি বাবা মায়ের সাথে।
    আমি শুভ, শুভ আহসান। ঢাকা থেকে এসেছি, পড়ালেখার ফাঁকে এখন অবসর, অবসর কাটাতে এলাম।

আচ্ছা, এখন আসি। সকালে আবার দেখা হতেও পারে। তখন না হয় বাকী আলাপ হবে।

কল্পনার সাথে সখ্যতা করা শুরু করলো শাম্মী! ছেলেটির চোখে কি যেন জাদু আছে। বার বার চোখে এসে পড়ে চেহারা। যেখানে কলেজের এত ছেলে, পাড়ার ছেলেরা শাম্মীর নজর কাটতে পারেনি সেখানে শুভ মাত্র কয়েক পলকে কেড়ে নিলো মন। কিন্তু কয়েক পলকেতো মানুষ চেনা যায়না। চেনা যায় না তার চরিত্র আর তার মন। অতোশতো শাম্মী বুঝে না, বুঝার প্রয়োজন ও মনে করে না। ভোরের অপেক্ষা না ঘুমানো রাত শেষ হলো। নাস্তার টেবিলে যাওয়ার আগে মা বাবাকে আসতেছি বলে ঢুঁ মারতে গেলো ৩০৪ এ। সেখানে গিয়ে দেখে রুম লক! একরাশ হতাশায় ফিরতে হলো।

২.
আজ ১৪ ফেব্রæয়ারি। এই দিনটিকে সামনে রেখেই সমুদ্র সৈকতে এসেছিলো শুভ। ভালোবাসা কি? সমুদ্রের ভালোবাসার রূপ কেমন? ভালোবাসা দিবসটিতে সমুদ্র সৈকত কেমন সাজে সাজে? এসব প্রশ্নের উত্তর এবারের ভিন্নতা কি তা খুঁজবে বলে দু’দিন আগেই শুভ এসেছিলো।
পড়ন্ত বিকেল বসে আছে সেখানে, যেখানে শাম্মীর সাথে শুভর ধাক্কা লেগেছিলো।

  • আরে আপনি এখানে! মনে মনে আপনাকে খুঁজছিলাম।
    -কেন বলুনতো?
    -কেন জানিনা।
    -আপনি একলা!?
    -দোকলা কোথায় পাবো? যে বন্ধুর সাথে এসেছি তারও আজ জরুরী কাজ পড়ে যাওয়ায় ঢাকায় ডাক পড়েছে।
    -না, মানে স্পেশাল কারো কথা বলছিলাম। আজকে এমন একটা দিনে একা একা কেমন যেন লাগে না?
  • কেমন লাগে জানি না। ভিন্ন কোন অভিজ্ঞতা আজো হয়নি। মনে খুঁজে পায়নি ভিন্ন অভিজ্ঞতা শেয়ার করার মত কাউকে।
  • আপনি ও যে একা?
  • যদি বলি আমার ব্যাপারটাও আপনার মত।
    -তাহলে শাম্মী-সমুদ্রের কাছে আসলেন যে?
    সমুদ্র ভালো লাগে, সমুদ্র আমাকে কাছে টানে। তাই প্রতি বছর সমুদ্রের ভালোবাসা পেতে এসময় আসি।

৩.
সকালে শুভ টিকেট, তার সমুদ্র দেখা হয়ে গেছে। দু’দিনের জন্য এসেছিলো। সময় শেষ। এবার এসে শুভ এবার ভালো সময় কাটিয়েছে। শাম্মীর সাথে আড্ডায় ভালো সময় কেটে গেল। শুভ যাওয়ার কথা শাম্মীকে বলেনি। কি দরকার শুধু শুধু মায়া বাড়ানোর। আবার ভাবে একেবারে না বললে স্বার্থপরতা হয়ে যাবে। শাম্মীর মত শুভও যেন শাম্মীর প্রতি কিছুটা দূর্বল হয়েছে সে কথাও অস্বীকারের সুযোগ নেই।
সকালে হোটেল রিসিপশন থেকে নিজের নামের চিঠিটা নিলো। খুলে দেখে শুভর লেখা।

শাম্মী,
চলে গেলাম। বলে যাইনি বলে দুঃখিত। জীবনের চলতি পথে দেখা হয়ে গেল। বিধাতা চাইলে আবার কখনো দেখা হতে পারে।
আপনাকে বলা হয়নি-আপনার হাসিটা খুব সুন্দর। বাম গালে টোল পড়াটা দেখলে অবাক চেয়ে দেখতে মন চায়। চুলগুলো সব সময় ছেড়ে দিবেন। কপালে ছোট টিপ পরলে দেখতে খুব ভালো লাগবে। চোখে হালকা ফ্রেমের চশমা ভালো মানিয়েছে আপনাকে। ভালো থাকুন সব সময়।
— শুভ

  • তাহলে শুভও কি আমার মতো করে ভেবেছিলো। কই শুভর আচরণে তো বুঝা গেল না।
    এভাবে আস্তে আস্তে শুভর প্রতি শাম্মীর ভালোবাসা আরো বাড়তে শুরু করলো। শুভ মোবাইল নাম্বার না দিয়ে ঠিকানা দিলো। তার দেয়ার ঠিকানায় চিঠি লেখে শাম্মী একটি দুটি করে অনেকগুলো, প্রত্যেকটা চিঠিতে শাম্মীর মনের অব্যক্ত কথাগুলো লিখতো। অনেক অপেক্ষা পরও একটি চিঠির উত্তর এলো না। শুভর এই আচরণ শাম্মীকে অবাক করে। এধরণের আচরণ শুভতো করার কথা নয়। যে ছেলে তার হৃদয়ের অজান্তে ভালোবাসার কথা বলেছিলো সে আজ এতদিন ধরে নীরব কিভাবে থাকে। এ ব্যাপারটা শাম্মীকে ভাবিয়ে তুললো। আর তর সইলো না।
  • না আর নয়…

৪.
অবশেষে শুভর ঠিকানায় শাম্মী গিয়ে জানতে পারে, সেদিন কক্সবাজার থেকে আসার পথে সড়ক দূঘর্টনায় শুভ মারা যায়।

এখন এলোমেলো জীবন। একাকী পথ চলা। এখন দিন যায় শুভর কথা মনে করে। জীবনের অব্যক্ত কথাগুলো, অব্যক্তই থেকে গেলো! কষ্টরা আষ্টেপৃষ্টে বসতি গড়তে থাকে।

কয়েক বছর পরে আবার ১৪ ফেব্রæয়ারিতে সমুদ্র সৈকতে শাম্মী। আজ শুভ বিহীন।
সূর্য অন্ধকারে নিজেকে হারিয়ে নেয়ার অপেক্ষায়। সমুদ্রের জলে লাল আভা বিলীন হচ্ছে অন্ধকারের গ্রাসে। এরকম কত সূর্যই না অস্ত গিয়েছে এ সৈকতে। তার সাথে প্রতিনিয়ত অস্ত যাচ্ছে অপেক্ষার জ্বলন্ত সূর্যটি। এ সৈকতেইতো শুভ আর শাম্মীর দেখা, হালকা আলো-অন্ধকারে চোখাচোখি তারপর…

মাঝে কেটে গেলো কয়েক বছর। শুভ চলে যাওয়ার পর এই প্রথম শাম্মী সমুদ্র সৈকতে। পূর্বাকাশে সূর্য ওঠার সাথে হৃদয়ে যেন অপেক্ষার নতুন সূর্যটি উদিত হয় শাম্মীর। সূর্য ডোবার সাথে সাথে হৃদয় দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে যায়, প্রতিনিয়ত অস্ত যায় আরেকটি অপেক্ষার প্রহর। শাম্মী স্বপ্ন দেখেছে দু’জনে এক সাথে আবার সমুদ্র দেখতে আসবে। আসা আর হলো কই। হবে না এই জনমে। তবুও শুধু অপেক্ষা আর অপেক্ষা। এ অপেক্ষার শেষ কোথায়? যার জন্য অপেক্ষা সে তো আজ দূর বহুদূরে…