বিশিষ্ট চক্ষুচিকিৎসক অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন আর নেই

মীরসরাই প্রতিনিধি :
দেশের চক্ষুচিকিৎসাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, প্রত্যন্ত অঞ্চলে লাখো মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অন্যতম অগদূত অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন আর নেই। বার্ধক্যজনিত কারণে শনিবার (২৭ জুন) দুপুর সাড়ে ১২টায় চট্টগ্রাম নগরের ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।
অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (সিইআইটিসি) উপদেষ্টা এবং সাবেক ম্যানেজিং ট্রাস্টি ছিলেন। তিনি দুই পুত্র ডা. রাজীব হোসেন ও রিয়াজ হোসেন, নাতি-নাতনি, আত্মীয়স্বজন এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শনিবার এশার নামাজের পর চট্টগ্রাম নগরীর জমিয়তুল ফালাহ ময়দানে তাঁর প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। রোববার (২৮ জুন) সকাল ৯টায় চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় জানাজা এবং মীরসরাই উপজেলার কাটাছরা ইউনিয়নের ওয়াহিদুন্নেছা মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে জোহর নামাজের পর তৃতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।

চক্ষুচিকিৎসাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের অবদান দেশের চিকিৎসা ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। মীরসরাইয়ের সমাজসেবক ডা. আহমেদুর রহমান ও ওয়াহিদুন্নেসার একমাত্র পুত্র তিনি। চক্ষুরোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসাসেবা বিস্তারের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতি গঠন করেন। একই বছর দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ চক্ষু শিবির পরিচালনার মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখেরও বেশি রোগীর চোখের অপারেশন সম্পন্ন করা হয়। ১৯৭৫ সালে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষার উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রায় আট লাখ শিক্ষার্থীর চোখ পরীক্ষা করা হয়। ১৯৭৩ সালে একদল চক্ষু বিশেষজ্ঞকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (সিইআইটিসি), যা বর্তমানে সাধারণ মানুষের কাছে পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতাল নামে বেশি পরিচিত। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব কমিউনিটি অফথালমোলজি প্রতিষ্ঠায়ও তিনি মুখ্য ভ‚মিকা পালন করেন। এ প্রতিষ্ঠান থেকে এখন পর্যন্ত ২৬৬ জন চিকিৎসক স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। পাশাপাশি চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উদ্যোগে চার বছর মেয়াদি ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন অপটোমেট্রি কোর্সও চালু রয়েছে।

দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চক্ষুচিকিৎসায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন বহু সম্মাননা লাভ করেন। এর মধ্যে রয়েছে ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানির প্রেসিডেন্ট প্রদত্ত ‘দি অর্ডার অব মেরিট’, ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর প্রিভেনশন অব ব্লাইন্ডনেসের ‘দি লাইফ লং সার্ভিসেস অ্যাওয়ার্ড’, ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অব অফথালমোলজির ‘কংগ্রেস অব অফথালমোলজি অ্যাওয়ার্ড’, এশিয়া প্যাসিফিক একাডেমি অব অফথালমোলজির ‘দি ডিস্টিংগুইশড সার্ভিসেস অ্যাওয়ার্ড’ ও স্বর্ণপদক, ‘বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড’, ‘চট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক’, ‘বাংলাদেশ কমিউনিটি অফথালমোলজি স্বর্ণপদক’, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অনারারি ডক্টরেট’ এবং ‘দ্য ডেইলি স্টার অ্যাওয়ার্ড’। তিনি পেনিলপ বিলসন চেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপকও ছিলেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দিয়েছেন। এশিয়া প্যাসিফিক একাডেমি অব অফথালমোলজিতে ২০ বছরের বেশি সময় জাতীয় কাউন্সিলর ও আঞ্চলিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর প্রিভেনশন অব বøাইন্ডনেসের চেয়ারম্যান হিসেবে টানা আট বছর নেতৃত্ব দেন। এছাড়া তাঁর উদ্যোগে ৩৫০ শয্যার বিশ্বমানের ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল ও নার্সিং ট্রেনিং সেন্টার গড়ে ওঠে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মজীবনী ‘প্লেজার অ্যান্ড পেইন’।