১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ - ১লা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের দাফন সম্পন্ন

মীরসরাই প্রতিনিধি :
মহান সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, সাবেক মন্ত্রী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে (১৪ মে) নিজ এলাকা মীরসরাইয়ের ধুম ইউনিয়নের মহাজনহাট ফজলুর রহমান স্কুল এন্ড কলেজ মাঠে তৃতীয় জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে।
এসময় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গার্ড অব অর্নার প্রদান করা হয়। জানাজা শেষে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। সর্বশেষ তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় নগরীর জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এসময় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ছাড়াও সাধারণ জনগণকে জানাজায় অংশ নিতে দেখা যায়।
জানাযায় ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মেজ ছেলে সাবেক সংসদ সদস্য মাহবুব রহমান রুহেল বলেন, ‘আজ মীরসরাইবাসীর জন্য অনেক কষ্টের দিন। দীর্ঘদিন আইসিইউতে থাকার পর আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে আমার বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আমার বাবা চট্টগ্রাম তথা মীরসাইয়ের উন্নয়নের জন্য আজীবন কাজ করে গেছেন। সবাই আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন।’
বৃহস্পতিবার বিকেলে মীরসরাইয়ে অনুষ্ঠিত ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জানাযায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের যাতে বাধা দেওয়া না হয় সেজন্য বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহবান জানান মীরসরাইয়ের সংসদ সদস্য ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক নুরুল আমিন। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ফেইসবুক একাউন্টে ঘোষণা দেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি, বৃহস্পতিবার মীরসরাই উপজেলার কোথাও আমাদের কোনো দলীয় কমসূচি নেই। সুতরাং সংগঠনের নামে কোন ব্যক্তি কমসূচির কথা বলে জনমনে এবং নেতাকর্মীদের মাঝে যেন বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে না পারে সেই বিষয়ে সকল নেতাকর্মীদের সজাগ থাকার জন্য আহবান জানাচ্ছি।’
এরআগে গত ১৩ মে সকাল সোয়া ১০টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ২০১৯ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কার বা স্বাধীনতা পদক লাভ করেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ৭ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টনে বিএনপি কার্যালয়ে হামলা ও বিএনপি কর্মী মকবুল হত্যার ঘটনায় করা মামলায় ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে মোশাররফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। পরে আরও বেশ কিছু মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। কারাগারে থাকা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়লে ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট সব মামলায় জামিন পেয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। এরপর থেকে শ্বাসতন্ত্রের জটিলতাসহ নানা শারীরিক অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। পারিবারিক জীবনে স্ত্রী আয়েশা সুলতানার সঙ্গে সংসার জীবন কাটিয়েছেন তিনি। তাদের তিন ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। মেজ ছেলে মাহবুব উর রহমান রুহেল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১ মীরসরাই আসনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
শিক্ষাজীবন :
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ ১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি মীরসরাই উপজেলার ধুম ইউনিয়নের ধুম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে থেকে মাধ্যমিক এবং স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে প্রকৌশল বিদ্যায় স্নাতক সম্পন্ন করার পর রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ছাত্রজীবনেই তিনি ছয় দফা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। দেশে ফিরে এম এ আজিজের হাত ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে শুভপুর সেতু উড়িয়ে দেওয়ার অভিযানে নেতৃত্ব দেন। পরে বিভিন্ন গেরিলা অভিযানে অংশ নেন।
রাজনৈতিক কর্মকান্ড :
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ১৯৭০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পরে চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই) আসন থেকে তিনি ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন মেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৬ সালে তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রেসিডিয়াম সদস্য (নম্বর-১) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধের তিনি ১ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় হুইপ নির্বাচিত হন। দলীয় রাজনীতিতে তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার হামলা ও নির্যাতনের শিকার হন তিনি। ১৯৮০ সালে চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকায় হামলায় তার পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়। ১৯৮৮ সালে শেখ হাসিনার মিছিলে পুলিশের গুলিতে আহত হন। ১৯৯২ সালে ফটিকছড়িতে হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হন।
সামাজিক ও ব্যবসায়িক কর্মকান্ড :
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের পিতা এস রহমান ছিলেন তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। তিনি ‘ওরিয়েন্ট বিল্ডার্স কর্পোরেশন’ এবং কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী ‘হোটেল সায়মন’ প্রতিষ্ঠা করেন। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনও ব্যবসায়িক কর্মকান্ডে যুক্তছিলেন। ১৯৮৩ সালে তিনি ‘গ্যাসমিন লিমিটেড’ নামে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ও কনস্ট্রাকশন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এছাড়া তিনি ‘দ্য পেনিনসুলা চিটাগাং’ হোটেলের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি শিক্ষা ও সামাজিক মূলক কাজ করার জন্য বাবা এস রহমানের নামে প্রতিষ্ঠা করেন এস রহমান ট্রাস্ট। পরবর্তীতে এস রহমান ট্রাস্টের অধীনে মহাজনহাট ফজলুর রহমান স্কুল এন্ড কলেজ, এস রহমান আইডিয়াল স্কুল ও ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।




