১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ - ১লা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মীরসরাই উৎসব মুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত

মীরসরাই প্রতিনিধি :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে চট্টগ্রাম-১ মীরসরাই আসনে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে মীরসরাই আসনে ১০৬টি কেন্দ্রে পুরুষ ও নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মতো। তবে দুপুরের পর অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কমতে থাকে। মীরসরাই আসনে ৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করলেও বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে ৪জন প্রার্থীর এজেন্টের উপস্থিতি দেখা গেছে। ভোট দিয়ে কেউ বলেছেন এটি জীবনের প্রথম ভোট; কেউ বলছেন এটিই হয়তো জীবনের শেষ ভোট। এদিকে সকাল সাড়ে ৭টায় ভোট শুরু করার কথা থাকলেও মীরসরাই সরকারী পাইলট কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শুরু হয় আধা ঘন্টা পর সকাল ৮টা থেকে। ভোট দেওয়ার জন্য অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতাল থেকে এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ভোট কেন্দ্রে যান যুবদল নেতা কামরুল হাসান বাপ্পি।

সরেজমিনে দেখা যায়, মীরসরাই সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট গ্রহণে নির্ধারিত সময়ের সাত মিনিট পর খোলা হয় ভোটকেন্দ্রের গেইট। ভোট গ্রহণ শুরু হয় অন্তত ১০ মিনিট পর। ১২ ফেব্রæয়ারি সকাল ৭.৩০ টায় গেইট খোলার কথা থাকলেও ৭.৩৭ মিনিটে কেন্দ্রের গেইট খুলতে দেখা গেছে। এসময় উপস্থিত ভোটাররা অপেক্ষায় ছিলেন। বিলম্বে গেইট খোলার কারণে আনুষাঙ্গিক প্রস্তুতি নিয়ে ভোট দেওয়ার শুরু করতে লাগে আরো অন্তত ১০ মিনিট। সকাল ৭ টা ৪৭ মিনিটে ভোট গ্রহণ শুরু করতে পারেনি। এ সময় ভোটাররা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে আসা ভোটার শেখ আহমদ বলেন, সকাল সাড়ে সাতটার আগেই আমরা ভোট কেন্দ্র এসেছিলাম। কিন্তু ভোট কেন্দ্র গেইট খুলছিল না এতে নারী পুরুষ ভোটার গেইটে অপেক্ষা করছিল। সাত মিনিট পর গেইট খুললেও ভোট গ্রহন শুরু হয় সকাল পৌনে ৮টার পর।
এ বিষয়ে ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মেহেদী হাসান বলেন, এরকম হওয়ার কথা নয় এরপর আমি খবর নিচ্ছি কেন দেরি হল। প্রিজাইডিং অফিসার জানান এই ভোটকেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ৩৯৭৫। মোট বুথ রয়েছে ৭ টি।
মীরসরাই সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা শতবর্ষী ওজিবা খাতুন বলেন, ‘আমার অনেক বয়স হয়ে গেছে। এই জীবনে অনেকবার ভোট দিয়েছি। শরীর অসুস্থ, তবু এবার নিজের ভোটটা দিতে এসেছি। মনে হচ্ছে আর বেশি দিন বাঁচব না। এবারের দেওয়া ভোটই হয়তো আমার শেষ ভোট। আমি চাই ভোটের মাধ্যমে দেশে শান্তি ফিরে আসুক।’
ওজিফা খাতুনের ভাইয়ের ছেলে জাহেদ হোসেন বলেন, ‘আমার ফুফুর বয়স এক’শ ছাড়িয়েছে। সকাল থেকে কেন্দ্রে এসে ভোট দিতে উদ্গ্রীব হয়েছিলেন তিনি। আমরা তাঁকে কেন্দ্রে নিয়ে এসেছি। সকাল সকাল কেন্দ্রে এসে ভোট দিতে পেরে দারুণ খুশি তিনি।’
সকাল সাড়ে ৮টায় পূর্ব দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দেখা যায়, ভোটারদের দীর্ঘ উপস্থিতি। নারী-পুরুষের দীর্ঘ লাইন। ভোট দিতে আসা মো. সিরাজুল ইসলাম (৬৫) বলেন, দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকায় প্রথম সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে এসেছি। ভোট দিতে এসে গ্রামের অনেকের সাথে দেখা হয়েছে। অনেক ভালো লাগছে।
প্রবাসী মো. মোস্তফা বলেন, দীর্ঘ ২৬ বছর পর প্রথম ভোট দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছি। বিদেশে থাকায় ভোট দেওয়া হয়নি আগে।
আরেক ভোটার মো. আলাউদ্দিন বলেন, আমি এবার প্রথম ভোট দিয়েছি। নিজের অধিকার আদায় করতে পেরে ভালো লাগছে।
পূর্ব দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মোহাম্মদ সামছুল আলম বলেন, এ কেন্দ্রে ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা, লাঙ্গল, আপেল প্রতীকের এজেন্ট দায়িত্ব পালন করছেন। সকাল থেকে কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি ছিলো ভালো।
সকাল সাড়ে ৯টায় মিঠাছরা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, নারী ও পুরুষের দীর্ঘ লাইন। ভোট দিতে আসা হাসি বিশ্বাস বলেন, ভোটগ্রহণ অনেকটা ধীরগতির হলেও ভোট সুষ্ঠু হচ্ছে। সকাল সকাল এসে ভোট দিতে পেরে ভালো লাগছে।
মিঠাছরা উচ্চ বিদ্যালয় মহিলা কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মো. দিদারুল আলম বলেন, এ কেন্দ্রে মোট ভোটার ৩২৯৫ জন। কেন্দ্রে ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা, লাঙ্গল, আপেল প্রতীকের এজেন্ট দায়িত্ব পালন করছেন।
দুপুর ১টায় হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়ে অ্যাম্বুুলেন্সে এসে বেডে শুয়ে মলিয়াইশ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত মো. কামরুল হাসান বাপ্পি। তিনি মিঠানালা ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য সচিবের দায়িত্বে রয়েছেন। এর আগে নির্বাচনী প্রচারণায় গিয়ে ১৫ দিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। দুর্ঘটনার পর থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন বাপ্পি। নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে থাকতে না পারলেও ভোট দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প ছিল তাঁর।
কামরুল হাসান বলেন, ‘১৫ দিন আগে নির্বাচনী প্রচারণায় যাওয়ার পথে মিঠানালা এলাকায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলাম। এবারের গুরুত¦পূর্ণ জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রচারণায় পুরো সময় থাকতে না পারলেও যেকোনো উপায়ে ভোট দেওয়ার সংকল্প ছিল। তাই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসকের অনুমতি নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে এসে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়েছি।’
মলিয়াইশ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা মো. শাহ আলম বলেন, ‘বেলা একটার দিকে এই কেন্দ্রে অসুস্থ এক ভোটার হাসপাতাল থেকে ভোট কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন। তাঁর ভোট দেওয়ার বুথ কেন্দ্রের দ্বিতীয় তলায় হওয়ায় আমরা বিপাকে পড়ি। পরে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে চারজন সহযোগী দিয়ে ওই ভোটারকে দ্বিতীয় তলায় নিয়ে গিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করি আমরা। এতে আমাদের কিছুটা কষ্ট হলেও ওই ভোটার ভোট দিতে পেরেছেন, এটি ভালো লেগেছে।’
দুপুর ২টায় বারইয়ারহাট কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে জানা যায়, সকালে ভোটার উপস্থিতি থাকলেও দুপুরের পর ভোটার অনেকাংশে কমে যায়। প্রিজাইডিং কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ বলেন, ৯টি বুথে ৪৭৬৫ ভোটের মধ্যে সংগ্রহ হয় ২৪২৮ ভোট। ভোট পড়ে ৫১%। একেন্দ্রে এজেন্ট ছিলো ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা, লাঙ্গল ও আপেল প্রতীকের।
দুপুর আড়াইটায় দক্ষিণ আমবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় মাঠে ভোটার শূণ্য। প্রিজাইডিং অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ৯টি বুথে ৪৮৯৯ ভোটের মধ্যে দুপুর আড়াইটায় ২৫৪১ ভোট সংগ্রহ হয়। ভোট পড়ে ৫২%। সকালে ভোটার উপস্থিতি ভালো থাকলেও দুপুরের পর ভোটার কমে যায়।
উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনে মীরসরাই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৬৭৪ রয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯৯ হাজার ৮৫৯ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮১১ জন এবং এর মধ্যে তৃতীয় লিঙ্গ ভোটার আছে ৪ জন। পোস্টাল ব্যালট রেজিষ্ট্রেশন করেছেন ৬ হাজার ৫৭২। পোস্টাল ছাড়া ভোটার হলো ৩ লাখ ৮০ হাজার ১০২টি ভোট। মোট কেন্দ্র ১০৬টি, মোট বুথের সংখ্যা ৭১৮টি। ১০৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ২১টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ৭৫টি ঝুঁকিপূর্ণ, ২টি সাধারণ কেন্দ্র রয়েছে।
মীরসরাই আসনে ৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিত করছেন। তারা হলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি মনোনীত প্রার্থী (ধানের শীষ) নুরুল আমিন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী (দাঁড়িপাল্লা) মোহাম্মদ ছাইফুর রহমান, জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী (লাঙ্গল) সৈয়দ শাহাদাৎ হোসেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী (হাতপাখা) ফেরদৌস আহমদ চৌধুরী, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী (আপেল) রেজাউল করিম, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল মনোনীত প্রার্থী (হাত-পাঞ্জা) শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জেএসডি মনোনীত প্রার্থী (তারা) প্রার্থী এ.কে.এম আবু ইউছুপ।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নুরুল আমিন বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর ভোটাররা ভোট দিতে পেরে অনেক খুশী এবং আনন্দিত। এবারের ভোটে সব বয়সী মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। কোনরূপ সহিংসতা ছাড়া ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোটের আগে মিরসরাই উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ ভালো ছিলো; আগামীতেও যাতে শান্ত থাকে তার জন্য আমি নেতাকর্মীদের অনুরোধ জানিয়েছি।
জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী এডভোকেট মোহাম্মদ ছাইফুর রহমান বলেন, সকাল থেকে উপজেলার প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটাররা উৎসবমুখর পরিবেশে অংশ নিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। বেশ কিছু কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে সুষ্ঠ ভোট হচ্ছে বলে আমার মনে হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধির স্প্রিড ছিলো কম।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারি রিটার্নিং কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তার বলেন, উৎসবমুখর পরিবেশে ও শান্তিপূর্ণ ভাবে মীরসরাই আসনে নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। মীরসরাই আসনে ১০৬ কেন্দ্রে মোট ৩ লাখ ৮০ হাজার ১০২ ভোটের মধ্যে মোট ভোট পড়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৪১৬ ভোট। বৈধ ভোটের সংখ্যা ২ লাখ ১৩ হাজার ৮৪৩। বাতিলকৃত ভোটের সংখ্যা ৫ হাজার ৫৭৩। ভোটের হার ৫৫.৩০%। ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৪৫ ভোট পেয়ে বেসরকারি ভাবে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নুরুল আমিন নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধী জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী এডভোকেট মোহাম্মদ ছাইফুর রহমান পেয়েছেন ৮১ হাজার ২২৭ ভোট।




